Link copied!
Sign in / Sign up
3
Shares

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং আপনার শিশু


 

ডাক্তারখানায় এমন একটা দিনও যায় না যেদিন কোন বাচ্চার মা অভিযোগ করছেন না, “ডাক্তারবাবু, আমার বাচ্চা কিছুই খায় না। প্লীজ, একটা কিছু করুন”, এবং পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা দাদু দিদারা সমর্থনে মাথা নাড়েন না। সত্যি বলতে কি, বাচ্চাদের খাওয়া সংক্রান্ত প্রশ্নই সব থেকে সাধারন প্রশ্ন যা প্রায় সবার কাছ থেকে আসে, কিন্তু যার সন্তোষজনক উত্তর দেওয়া সবথেকে কঠিন। একজন কমবয়সী মা পরিবারের সদস্য, বন্ধু, ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া, সমবয়সী বন্ধুবান্ধব ইত্যাদি বিভিন্ন উৎস থেকে প্রচুর সংখ্যায় পরস্পরবিরোধী মতামত এবং উপদেশ পান এবং তাঁরা প্রভাবিতও হন গভীরভাবে প্রোথিত পরম্পরাগত অভ্যাস, প্রাচীন বিশ্বাস এবং বাচ্চাদের খাদ্যাভ্যাস সংক্রান্ত ভুল ধারণার দ্বারা। বাচ্চাকে খাওয়ানোর জন্য ঘন্টা অতিক্রম করে চেষ্টা করে যাওয়া রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ব্যতিক্রম খুব কমই দেখা যায় এবং এই পদ্ধতির অনুসরণ অনেক অভিভাবকের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদেরকে একটু চিন্তামুক্ত করার জন্য এটি আমার ছোট্ট প্রচেষ্টা। (ডা. নবীন কিনি)

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস সবসময় শৈশব থেকেই শুরু করা উচিত এবং সবথেকে ভালোভাবে শুরু করার পথ হল বাচ্চার বয়স ৬ মাস হওয়ার আগে পর্যন্ত তাকে সম্পূর্ণভাবে মাতৃদুগ্ধ পান করিয়ে বড় করান। গরুর দুধ বাছুরের জন্যই মানানসই এবং ফিডিং বোতলগুলোকে বিপনিগুলির সাজানো তাকেই থাকতে দেওয়া ভাল। সম্পূর্ণভাবে মাতৃদুগ্ধের উপর থাকলে বাচ্চারা তাদের প্রয়োজন অনুসারে নির্ধারিত পুষ্টি পাবে যা তাদের মস্তিস্কের বিকাশ ত্বরান্বিত করতে এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজন (এবং যার ফলে কান ও শ্বাস যন্ত্রের সংক্রমন এবং ডায়ারিয়ার সম্ভাবনা কম থাকে)।

৬ মাস বয়সে বুকের দুধ ছাড়ানোর পর বাচ্চার অভিভাবকেরা তাদের বাচ্চাকে সঠিকভাবে চেনার সুযোগ পান। নতুন স্বাদ এবং বৈচিত্র্যের খাবার খাওয়ার ব্যাপারে তাদের স্বাভাবিক কৌতূহল এবং আগ্রহকে নিয়ন্ত্রন করতে পারেন যাতে খাওয়াটা তাদের কাছে এক বিশেষ আনন্দদায়ক অনুভূতি হয়ে ওঠে। শিশুর খাদ্যাভ্যাস সংক্রান্ত সমস্যা সবথেকে বেশী দেখা যায় এইসময় এবং যদি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তবে খাবার খাওয়া শিশুর কাছে বেশী যন্ত্রণাদায়ক কাজ হয়ে ওঠে। আপনার বাচ্চার এই পর্বের বিকাশকে উপলব্ধ্বি করতে গেলে প্রাচীন ধারণা, ভুল উপদেশ এবং ব্যক্তিগত উদ্বেগ ইত্যাদি বিষয়কে সরিয়ে রাখতে হবে। কিছু উদাহরণ দেওয়া হল।

বাচ্চার পছন্দকে সম্মান করুন, তার উপর কিছু চাপিয়ে দেবেন না, বাচ্চাকে এমন কিছু খেতে দেবেন না যা শিশুটি পচ্ছন্দ করে না।

শিশুকে অন্যমনস্ক করে দিয়ে খাওয়াবেন না। একটা নির্দিষ্ট জায়গায় বসিয়ে শিশুকে খাওয়ানোর অভ্যাস করুন, যেমন উঁচু চেয়ার বা খাওয়ার টেবিল। কিন্তু টিভির সামনে বসিয়ে বা বাড়ির বাইরে নিয়ে গিয়ে, বাগানে বা রাস্তায় নিয়ে গিয়ে খাওয়ানো কখনই নয় ।

বাচ্চার সম্পূর্ণ পেট ভরে যাওয়ার একটু আগেই খাওয়ানো বন্ধ করুন এবং পাত্রের সব খাবারটা খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন না।

বিভিন্ন গন্ধ ও স্বাদের খাবার দেওয়ার চেষ্টা করুন। আপনি নিয়মিত যে সমস্ত খাবার খান একটি শিশুর ১ বছর বয়স হওয়ার মধ্যেই তার সেই সব খাবার সম্বন্ধে পরিচিত হয়ে যাওয়া দরকার। শিশুদের মাতৃদুগ্ধ ছাড়ানোর জন্য সাধারনত যে খাবারগুলি সুবিধাজনক তার মধ্যে আছে থেঁত করা ফল ও সব্জী, রাগীর ডালিয়া, খিচুড়ী, পোঙ্গাল, ডালভাত, ইত্যাদি এবং সহজলভ্য অর্থকরী সাধারণ খাদ্য শস্যদানা ।

বাচ্চাকে হাতের আঙুল দিয়ে বা চামচ দিয়ে নিজের চেষ্টায় খেতে উৎসাহ দিন। এই অর্জিত দক্ষতা যাকে বলে হাত-মুখের সংযোগ। ভবিষ্যতে হাত দিয়ে করতে হবে এমন কাজের জন্য এই দক্ষতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে হাতের লেখা এবং আঁকা।

 

আমার বাচ্চার জন্য দিনে কতবার খাবার দেওয়া জরুরী?

দিনে ৩ বা ৪ বার অল্প পরিমাণের খাবার, বিশেষ করে প্রাতঃরাশ, মধ্যাহ্নের আহার, বিকেলের জলখাবার এবং রাতের খাবার খাওয়ার এই পদ্ধতি সবসময়ই দিনে একবার প্রচুর পরিমাণে খাওয়ার থেকে ভাল।

প্রাতঃরাশ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ যেহেতু আপনি আগের রাতে অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকার পর অনাহার ভঙ্গ করছেন। সকালবেলায় অল্প পরিমাণে খেয়ে নিলে দিনের পরবর্তী কোন সময় একবারে অনেক খানি খাওয়ার হাত থেকে রেহাই পাবেন। এর থেকেই বোঝা যায় যে সাধারনভাবে স্কুলের কিছু বাচ্চা , বিশেষ করে যারা স্কুলে খুব চাপে থাকে, তারা প্রাতঃরাশের খাবার পছন্দ করে না। তাদের জোর করে সকালের খাবার খাওয়ালে তাদের পেটব্যথা করে এবং তাদের খেতে বাধ্য করলে তাদের বমী হয়, তাদের বিরক্ত না করাই ভাল যতদিন না তারা স্কুলের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছে। নিশ্চিতভাবে তাদের জন্য স্বাস্থ্যকর কোন নোনতা খাবার পাঠান, যা বাচ্চাটি ইচ্ছে করলে পরে খেতে পারবে।

 

আমার বাচ্চারা কি ধরণের খাবার খাবে?

প্রায় সব অভিভাবকই এই প্রশ্নে থমকে যান এবং এই বিষয় নিয়ে সারা বিশ্বেই আলোচনা হয়। বিভিন্ন প্রাচীন ভাবনা, সংস্কৃতিগত বিশ্বাস, ভুল ধারণা এবং অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত থেকে তৈরি হয় সন্দেহ এবং উদ্বেগ। ইউএসডিএ (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি দপ্তর) দ্বারা সুপারিশ করা ১৯৯২ সালে প্রকাশিত “ফূড পিরামিড” ভাবনার সঙ্গে আমরা বেশীরভাগ মানুষই পরিচিত এবং দশকের পর দশক ধরে এই ভাবনায় বিশ্বাসী।

এটি প্রধানত পিরামিড আকৃতির একটি কাঠামো চিত্র যার থেকে জানা যাবে প্রতিদিন প্রত্যেক প্রকারের মূল খাদ্যউপাদান সর্বাধিক কত বার খাওয়া যেতে পারে।

এই পিরামিড আকৃতির দুর্বলতাঃ

এই পরিকল্পনার মূল(নীচের) অংশে দেখানো হয়েছে অত্যাধিক মাত্রায় বেশী উপাদান সমৃদ্ধ খাদ্যতালিকা, কিন্তু এই পিরামিড দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে যে সম্পূর্ণত গমজাত আটা, বাদামী চাল বা অন্য সম্পূর্ণ শস্যদানা জাত খাদ্য দ্রব্য পরিমার্জিত খাদ্যদ্রব্য থেকে বেশী স্বাস্থ্যকর।

স্নেহ জাতীয় খাদ্য দ্রব্য, যেখানে “অল্প পরিমাণে ব্যবহার করুন” শিরোনাম দেওয়া হয়েছে, সেখানে উদ্ভিজ্জ স্নেহ পদার্থের উপকারিতাকে উল্লেখ করা হয় নি – এবং পরিবর্ত্তে সীমীত স্নেহ দ্রব্য বিশিষ্ঠ খাদ্যের উল্লেখ করা হয়েছে যা রক্তে কোলেস্ট্রেরল মাত্রা ঠিক রাখার জন্য বিপজ্জনক এবং ওজন বৃদ্ধি রোধ করার পক্ষেও অসুবিধাজনক।

এই পিরামিডে স্বাস্থ্যকর প্রোটীনগুলিকে (মাছ, মুরগী, বীন্স, এবং বাদাম) অস্বাস্থ্যকর প্রোটীনগুলির (জন্তুর মাংস এবং প্রক্রিয়াকৃত মাংস) সঙ্গে একই পর্যায়ভুক্ত করা হয়েছে।

এই পরিকল্পনা দুগ্ধজাত খাবারের উপর বেশী গুরুত্ব আরোপ করেছে।

 

আমার-থালা(MyPlate) -

আমার-থালা(MyPlate) পরিচিত চিত্র সহযোগে পাঁচটি ভিন্ন গোত্রের খাদ্যকে, যেমন ফল দানা শস্য, প্রোটিন, শাকসব্জী, এবং দুগ্ধজাত খাবারকে ব্যাখ্যা করেছে একটি পূর্ণাঙ্গ আহারের খাদ্য তালিকা হিসাবে।

আমার-থালা(MyPlate) যে মূল তথ্য ও নির্দেশ প্রদান করছে সেগুলি নিম্নরূপঃ

· আপনার খাবার থালার অর্দ্ধেকটা জুড়ে থাকুক ফল এবং সব্জী।

· আপনার শস্য জাতীয় খাবারের অন্তত অর্দ্ধেকটা হোক সম্পূর্ণ শস্যদানাজাত।

· প্রোটীন অল্প পরিমাণেই নিন।

· স্যূপ, পাউরুটি এবং প্রক্রিয়াজাত ঠান্ডা খাবার ইত্যাদি থেকে সোডিয়াম (লবণ) কমিয়ে দিন।

· ফ্যাটমুক্ত বা সীমীত ফ্যাট যুক্ত দুধ খাওয়ার অভ্যাস করুন।

· মিষ্টী পানীয় পান করার পরিবর্তে জল পান করুন।

· আপনার সারাদিনের শারীরিক কসরত এবং আপনার খাওয়া খাবারের মধ্যে একটি সাযুজ্য রক্ষা করুন।

· খাবার ভালবাসুন, কিন্তু অল্প পরিমাণে খান। একসঙ্গে বিপুল পরিমাণে খাওয়া এড়িয়ে চলুন।

 

আরো সহজভাবে বলতে গেলে -

খেয়াল রাখুন যেন আপনার শিশু প্রত্যেক আহার থালায় অর্দ্ধেক অংশ বিভিন্ন রঙের ফল এবং বিভিন্ন সব্জী দ্বারা ভর্তি থাকে (আলু এবং ফ্রেঞ্চ ফ্রাইকে এই খাবারের অন্তর্গত ভাববেন না)।

লক্ষ্য রাখুন যেন দানাশস্য জাত খাবার মোট খাবারের চারভাগের একভাগ হয়। প্রক্রিয়াজাত মসৃন দানা শস্যের পরিবর্ত্তে সম্পূর্ণ শস্যদানা গ্রহণ করুন। উদাহরণ হিসাবে সাদা চালের থেকে বাদামী চাল বেশী করে খান। চাপাটি তৈরী করার জন্য সম্পূর্ণ গমজাত আটা ব্যবহার করুন। সম্পূর্ণ শস্যদানা জাত পাস্তা এবং ময়দা থাকে তৈরী পাউরুটির পরিবর্তে গমের আটার পাউরুটি খান। সামান্য নুন এবং অল্প মাখন দিয়ে তৈরী পপকর্ণ নোনতা খাবার হিসাবে গ্রহণযোগ্য।

আহারের অন্য এক-চতুরাংশ হওয়া উচিত প্রটিন সমৃদ্ধ, যেমন ডাল, সম্বর, দানা শস্য, বাদাম, বীজ, ডিম এবং মাংস। জন্তুর মাংস এবং প্রক্রিয়াকৃত মাংসের বদলে হাল্কা ধরণের মাংস, যেমন, মাছ, মুরগী ইত্যাদি পছন্দ করুন।

আপনার নিত্য প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়ামের জন্য খান ডেয়ারী দ্রব্যাদি যেমন, দুধ, দই(ইয়োগার্ট), চীজ, পনীর ইত্যাদি। দুই বছরের শিশু, যারা খুব রুগ্ন নয়, তাদেরকে কম স্নেহ পদার্থ সমৃদ্ধ দুধ বা স্নেহ পদার্থ বর্জিত দুধ দেওয়া যেতে পারে, যার পরিমাণ হতে পারে দিনে ১ থেকে ২ গ্লাস। যে সমস্ত বাচ্চারা কোন কারণে দুধ সহ্য করতে পারে না তারা ডেয়ারী দ্রব্য ছাড়া ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার যেমন টোফু, মাছ(সার্ডিন, শ্যামন), পালং, মটর দানা, ওক্রা, বীন্স, তিলের দানা, অ্যামন্ড, ফিগ, কমলালেবু ইত্যাদি থেকে প্রোটিন পেতে পারেন।

খাদ্য তালিকাতে ফ্যাট এবং তেল ন্যূনতম পরিমাণে রাখুন। স্বাস্থ্যকর উভিজ্জ তেল ব্যবহার করুন যেগুলি এম.এউ.এফ.এ. (একক অসংপৃক্ত ফ্যাটী আসিড) এবং পি.এউ.এফ.এ (যৌগিক অসংপৃক্ত ফ্যাটী আসিড) দ্বারা সমৃদ্ধ যেমন রান্নার জন্য সূর্যমুখী, জলপাই বা চালের আবরণী থেকে উৎপন্ন তেল। জমা ফ্যাট যেমন মাখন, ঘি বা প্রাণীদেহ জাত তেল (যেগুলিতে অস্বাস্থ্যকর সংপৃক্ত ফ্যাটী আসিড) থাকে সেগুলির ব্যবহার এড়িয়ে চলুন। খাবার খুব কড়া করে ভাজার পরিবর্তে হালকা করে ভাজুন।

 

বার্কার প্রকল্প -

যে সমস্ত শিশুরা কম ওজন নিয়ে জন্মায় বা কোন সঠিক সময়ের আগেই জন্মে যায় অনিয়মিত খাদ্যগ্রহণ পদ্ধতির দ্বারা তাদের স্বাস্থ্য প্রভাবিত হয়। পিতা মাতার স্বাভাবিক প্রাকৃতিক আকাঙ্খায় তারা পৃথিবীতে আছে এবং বাবা-মা তাদের সুদেহী এবং স্বাস্থ্যবান দেখতে চান। প্রকৃত পক্ষে এই শিশুদের দেখাশুনা এবং এদের বিকাশের জন্য সযত্ন দেখভাল প্রয়োজন যাতে নিশ্চিত করা যায় যে তাদের ওজন স্বাভাবিক সীমার মধ্য আছে। আরো নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে যেখানে দেখা যাচ্ছে এই শিশুদের স্থূলতা, হৃদয়ঘটিত অসুখ, বহুমুত্র, রক্ত চাপ এবং স্ট্রোক জাতীয় শারিরীক অসুখের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে।

স্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণের অভ্যাস বয়স কাল পর্যন্ত যাতে বজায় থাকে, এইজন্য ছোট বয়স থেকে শুরু করা ভাল। মনে রাখুন যে অভিভাবক হিসাবে আপনারা শিশুদের রোল মডেল এবং শিশুদের সুন্দর খাদ্য তালিকা নির্মাণ শুরু করার জন্য খুব ভালো উদাহরণ।

Click here for the best in baby advice
What do you think?
0%
Wow!
0%
Like
0%
Not bad
0%
What?
scroll up icon