Link copied!
Sign in / Sign up
15
Shares

স্তন্যদুগ্ধ উৎপাদনের পাঁচটি পর্যায় কি?


সুস্থ শিশুই সুস্থ-সবল জাতি গঠনের প্রাথমিক ধাপ আর শিশুর জীবন বাঁচাতে মায়ের বুকের দুধই সেরা। স্তন্য দুগ্ধ নিয়ে সারা পৃথিবী জুড়ে যখন এমন সচেতনতার স্লোগান চলেছে তখন বুকের দুধের উপকারিতা সম্পর্কে অপ্রতুল জ্ঞান ও অজ্ঞতার কারণে আমাদের মত দেশে বহু শিশু মায়ের দুধ পান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আপনি যদি ভাবী মা হন তাহলে আপনাকেও মনে রাখতে হবে যে এর কোনও বিকল্প নেই। আপনি যখন মা হতে চলেছেন তখন আপনার শরীরের বেশ কিছু পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে যা আপনাকে মা হওয়ার অনুভবের আনন্দ দেবে।

যেমন আপনার পেট, কোমর বা পাছা ভারী হয়ে উঠতে, কিছুটা সময় লাগলেও মা হতে চলার প্রথম দিকেই আপনি অনুভব করবেন যে আপনার ত্বকের উজ্জলতা কেমন বেড়ে গেছে। এছাড়াও অনুভব করবেন যে আপনার স্তন দুটিও কিছুটা ভারী হয়ে উঠছে। এই সময় হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রপিন হরমোনের প্রভাবেই এই পরিবর্তন হয়- যা ইস্ট্রোজেন বা প্রজেস্ট্রেরন হরমোনের উৎপাদনে সহায়তা করে । তবে প্রথম পর্যায়েই স্তনের এই পরিবর্তন সকলের মধ্যে আসে না।

মনে রাখবেন আপনি যখনই গর্ভবতী হয়েছেন ঠিক তখন থেকেই আপনার শরীর স্তনদুগ্ধ তৈরির প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। শুরু হয়ে গেছে অক্সিটোসিন ও প্রোল্যাকটিন হরমোনের কাজ। আসুন জেনে নেওয়া যাক মায়ের বুকের দুধ উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপগুলো।

প্রথম ধাপ- ল্যাক্টোজেনেসিস-১

গর্ভাবস্থার ২য় ত্রৈমাসিকের সময় থেকেই এই পর্যায়ের শুরু। এই সময়কালে স্তনগ্রন্থিতে স্তন্য দুগ্ধ উৎপাদনের জন্য দায়ী হরমোনগুলো কাজ শুরু করে দেয়। সন্তান জন্মের ১ বা ২ দিনের মধ্যে বুকের দুধের উৎপাদন শুরু হয়ে যায়। জন্মের পর হলুদ,আঠালো যে দুধ নিঃসৃত হয় তাকে কোলোস্ট্রাম বা শালদুধ বলা হয়। এই দুধ-ই শিশুর প্রথম খাদ্য হিসেবে মানা হয়।

দ্বিতীয় ধাপ- ল্যাক্টোজেনেসিস-২

সন্তান জন্মের ৪দিন পর থেকে যে দুধ উৎপাদন শুরু হয় তা প্রথম দিকের মত ঘন হয় না। এই দুধের পরিমাণও অনেক বেশি। প্রচুর দুধ তৈরি হওয়ার ফলে বৃদ্ধি হয় স্তনেরও। অনেকের ক্ষেত্রে এই দুধ আসতে দিন দশেক সময়ও লেগে যায়। অনেক সময় স্থুলতার কারনে বা স্তন বৃন্তের গঠনের কারনে দুধ আসতে সময় লাগে।স্তন্যপানের মধ্যে একটা অনুভুতির প্রবাহ থাকে। আপনি শিশুকে দুধ খাওয়াচ্ছেন বা শিশু দুধ খাচ্ছে এই অনুভবই আপনাকে এক অসীম সুখ এনে দেয়।

তৃতীয় ধাপ- ল্যাক্টোজেনেসিস-৩

পোস্টপার্টাম পর্যায়ের নবম দিন থেকে এই ধাপের শুরু বলে ধরা হয় এবং তা চলে যত দিন না বুকের দুধ শেষ হয়। এই সময় দুধের সরবরাহ ঠিক রাখার জন্য নিয়ম করে স্তন টিপে দুধ বের করে দেওয়া হয়।

চতুর্থ ধাপ- ল্যাক্টোজেনেসিস-৪

আপনার শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করা থেকে ৪০ দিন পর পর্যন্ত এই ধাপ চলতে থাকে। এই ধাপেই বুকের দুধ কমতে কমতে ক্রমশ শেষ হয়ে যায়।

দেরিতে বুকে দুধ আসার সমস্যা

শারীরবিজ্ঞনের নিয়ম মেনেই সন্তান জন্মের সঙ্গে সঙ্গে মায়ের বুকে দুধ আসে। তবে কোনও কোনও ক্ষেত্রে মহিলাদের বুকে দুধ আসতে একটু দেরি হয়। খুব পরিশ্রমের কাজ করেন বা ডায়াবেটিস আছে এবং ইনসুলিন নিচ্ছেন অথবা হরমোন জনিত সমস্যার কারণে অনেক সময় বুকে দুধ আসতে দেরি হয়।

যদি কোনও কারণে আপনি এ ধরণের সমস্যায় পড়েন তা হলে অকারণ চিন্তিত হবেন না। এ সময় প্রচুর পরিমাণ তরল পানীয় খান এবং যথেষ্ট বিশ্রাম নিন। স্তন চিপে দুধ আনার চেষ্টা করুন এবং ডাক্তারের পরামর্শ মত দুধ বাড়ার সাপ্লিমেন্টারি ফুড খান।একই সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে বাচ্চার খাবারের বন্দোবস্ত করুন।

সন্তানকে দুধ খাওয়ানোর টিপস

আপনার সন্তানকে আপনি খাবার দিচ্ছেন, অর্থাৎ আপনার ভূমিকা অনেকটা ধরিত্রীর মত। এমন অবস্থায় আপনি যখন সন্তানকে খাওয়াচ্ছেন তখন একটা শান্ত, নিরিবিলি জায়গা বেছে নিন।

শিশুকে এমনভাবে কোলে নিন যাতে সে ভালভাবে দুধ খেতে পারে।

শিশুকে খাওয়ানোর আগে নিজ়ের স্তন ভাল করে পরিষ্কার করে নিন ও দুধের সুষম সরবরাহের ব্যবস্থা করে নিন।

দুধ খাওয়ানোর পর স্তনের নিপল পরিষ্কার করে রাখুন

এই সময় আপনি নরম ও পরিষ্কার পোশাক এবং ব্রা পরার চেষ্টা করুন।

শিশুর জীবন বাঁচাতে মায়ের বুকের দুধ :সুস্থ শিশুই সুস্থ-সবল জাতি গঠনের প্রাথমিক ধাপ। বুকের দুধের উপকারিতা সম্পর্কে অপ্রতুল জ্ঞান ও অজ্ঞতার কারণে দেশে বহু শিশু মায়ের দুধ পান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। স্তন্যদানকারী মা প্রসব পরবর্তী বিষন্নতায় কম ভোগেন। স্তবন্য দানকালে অক্সিটোসিন নামক একটি হরমোনের মাত্রা শরীরে বেড়ে যায় যেটি মানসিক রিল্যাক্সেশন (প্রশান্তি) আনে ।

সন্তান গ্রহণের ফলে শরীরে যে বাড়তি মেদ জমা হয়, স্তন্যদান করলে তা আবার কমে যায়। স্তন্যদান করানোর মাধ্যমে গর্ভধারণের পরে আবার শরীরের স্বাভাবিক আকারে ফিরে আসা সহজ হয়।

অজ্ঞতার কারণে শিশুকে মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত করায় দেশের শিশুর অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি ও শিশুর মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ। একটি শিশুর সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য মায়ের দুধের কোনো বিকল্প নেই।

শালদুধ কী ?

জন্মের পর হলুদ , আঠালো যে দুধ নিঃসৃত হয় তাই শালদুধ। সদ্য প্রসূতির স্তন থেকে বের হওয়া প্রথম দুধ৷ হলদেটে রং-এর এই দুধ পরিমাণে কম হলেও এতে থাকে শ্বেতকণিকা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা৷ শালদুধ শিশুর জন্য অত্যন্ত উপকারি, যা শিশুর জীবনের প্রথম টিকা হিসাবেও কাজ করে৷ শালদুধে থাকে আমিষ ও প্রচুর ভিটামিন-এ৷ শালদুধ শিশুর পেট পরিষ্কার করে এবং শিশুর জন্ডিস হবার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়৷এতে প্রচুর ইমিউনো গ্লোবিউলিন আছে ( Ig A বেশি ) যা শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।


মায়ের দুধের উপকারিতা

মাতৃদুগ্ধ শুধুমাত্র পুষ্টির উৎস নয়, শিশুর স্বাস্থ্যের পক্ষেও যেমন প্রয়োজনীয়,তেমনই মায়ের শরীরের পক্ষেও সমান উপকারী। জন্মের প্রথম ৬ মাস শিশুকে শুধুমাত্র মায়ের দুধই খাওয়ানো উচিত। তার কারণ : প্রসবের পর পর যে হলুদ রংয়ের দুধ আসে তাই শালদুধ। এই দুধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে এবং শিশুকে সংক্রমণ রোগ থেকে রক্ষা করে। এই শাল দুধ নবজাতকের জন্য খুবই প্রয়োজন। এই দুধ একটু ঘন, তাই অনেকে ফেলে দেয়। কোনোমতেই ফেলে না দিয়ে খাওয়াতে হবে।

ক.শিশুর জন্য উপকারিতা 

১। ইনফেকশনের হাত থেকে বাঁচায়

২। সহজে হজম ও শোষিত হয়

৩। বাচ্চার মস্তিষ্ক গঠনে সহায়তা করে

৪। বাচ্চাদের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়

৫। মায়ের সঙ্গে আত্মিক বন্ধন গঠন করে

৬। এটি সন্তানের জন্যে একটি সম্পূর্ণ খাবার

৭। বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে


খ. মায়ের জন্য উপকারিতা 

১। মায়ের জরায়ু সঠিক অবস্থানে ফিরে আসায় স্তন পান করানোর গুরুত্ব অনেক

২। পরবর্তী গর্ভধারণ প্রলম্বিত করে , ফলে অনেকটা জন্মবিরতিকরণ পিলের ন্যায় কাজ করে। শতকরা ৭০ ভাগ মায়ের বাচ্চাকে দুধ পান করানো পর্যন্ত ঋতুস্রাব হয় না যদি বাচ্চা এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং এ থাকে। কারণ প্রোল্যাক্টিন হরমোন এতে পরোক্ষ ভাবে বাধা দেয়।

৩। মায়ের স্তন ও ডিম্বাশয় ক্যান্সারে বাঁধা দেয়।

সঠিক পজিশন ও এটাচমেন্ট

মা ও সন্তানের , উভয়ের সুস্থতার জন্যেই প্রয়োজন সঠিক উপায়ে দুধ পান করানো। বাচ্চাকে সঠিক পজিশনে ধরতে হবে। বাচ্চার পুরো শরীর হাত দিয়ে তুলে ধরে দুধ খাওয়াতে হবে। বাচ্চা মায়ের বুকে লেগে থাকবে , মাথা ও শরীর সোজা থাকবে। নাক থাকবে মায়ের নিপল বরাবর। থুতনি মায়ের স্তনে ছুঁয়ে থাকবে। মুখ সম্পূর্ণ হা করে নিচের ঠোঁট বাইরের দিকে উল্টে রেখে খাওয়াতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে মায়ের বোঁটার চারপাশের কালো অংশের উপরিভাগই যেন বেশি দেখা যায়, নিচের ভাগ নয়।

সন্তান জন্মের ছয় মাসের পর থেকে মায়ের দুধের পাশাপাশি অন্যান্য খাবার দিতে হবে , একে কমপ্লিমেন্টারি ফিডিং বলে। এই খাবার হতে হবে পরিষ্কার ও নিরাপদ। সহজলভ্য ও সাধ্যের মধ্যে। শক্তি বর্ধক ( ভাত , রুটি , তেল , আলু ) , দেহ বৃদ্ধিকারী ( মাছ, মাংস , দুধ , ডিম , ডাল ) , ফল , শাকসবজি নরম করে খেতে দিতে হবে। তৃতীয় বছর থেকে বাচ্চা পরিবারের অন্যান্য দের মত নরমাল খাবার খেতে পারবে।

সন্তান অমূল্য সম্পদ। সব মা বাবাই চেষ্টা করেন সঠিক ভাবেই পালন করতে। জানার অভাবে যেন ভুল না হয় তাই এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। ভালো থাকুক আপনার শিশু আদরে আর যত্নে ।

Click here for the best in baby advice
What do you think?
0%
Wow!
0%
Like
0%
Not bad
0%
What?
scroll up icon